এভিয়ান পক্স এর কার্যকর চিকিৎসা


পক্স কেন হয় ?pox

পক্স হওয়ার প্রধান কারণ হলো মশার কামড়। মশার কামড়ের কারণে পাখির শরীরে যে ফোলা অংশটা তৈরী হয়, সেটাই আস্তে আস্তে গোটা বা পক্সে পরিণত হয়। এটা কোনো ছোঁয়াচে রোগ নয়, তবে যেই মশাটির কামড়ের কারণে পক্স হয়েছে সেটা অন্য পাখিকে কামড়ালে পক্স হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা থাকে।

লক্ষণ :

মশা কামড়ানোর পর উক্ত ফোলা স্থানটি ধীরে ধীরে লাল বর্ণ ধারণ করতে থাকে এবং ৫-৭ দিনের মধ্যেই এমন গোটায় পাখির সারা শরীর ভরে যায়। বিশেষ করে ডানার নিচের অংশে এটা বেশি হয়। পাখি খুব দুর্বল হয়ে পড়ে এবং ঠোট দিয়ে উক্ত অংশ গুলো চুলকানোর চেষ্টা করে।

প্রতিরোধ :

যেহেতু মশার কামড় থেকেই পক্স হয়, সেহেতু পক্স প্রতিরোধ করতে হলে আপনাকে অবশ্যই পাখিকে মশার কাছ থেকে দুরে রাখতে হবে। এ্যারোসল, কয়েল ইত্যাদি পাখির জন্য খুবই ক্ষতিকর, তাই এগুলোর কথা চিন্তাও করবেন না। মশা থেকে পাখিকে বাঁচানোর সবচেয়ে সহজ পদ্ধতি হলো মশারি। বিছানায় ব্যবহৃত মশারি দিয়ে সন্ধ্যার দিকে খাঁচা ঢেকে দিবেন, অথবা দোকানে যেয়ে খাঁচার সাইজ বললে তারা মশারি বানিয়ে দিবে। মশারি টাঙানোর সময় অবশ্যই খেয়াল রাখবেন যেন ভিতরে মশা না থেকে যায়। এছাড়া যাদের পাখি আলাদা ঘরে থাকে তারা জানালা এবং দরজা গুলোতে ছোট্ট ফাকযুক্ত নেট লাগাতে পারেন। এতে করে আপনার পাখি মশা তথা পক্স থেকে সুরক্ষিত থাকবে।

পক্স এর কার্যকর চিকিৎসা (By Sifat E Rabbani) :-

পাখির শরীরে পক্স দেখা মাত্রই অনেকে তাকে ঘর থেকে বের করার জন্য পাগল হয়ে যান, অন্য পাখিরও হবে এই ভয়ে। কিন্ত আগেই যেমনটা বলেছি, পক্স কোনো ছোঁয়াচে রোগ না, তাই অন্য পাখির সাথে রাখলে কোনো সমস্যা নাই। তাছাড়া এসময় পাখি খুব দূর্বল হয়ে পড়ায় নিজে খাওয়ার মত শক্তিও থাকে না, সেক্ষেত্রে তার সঙ্গী তাকে খাইয়ে দেয় এবং পাখিটাকে সুস্থ হতে সাহাজ্য করে। যাইহোক, পক্স দেখা মাত্রই আপনার সর্বপ্রথম কাজ হবে পাখি বের করে খাঁচাটা নিমের দ্রবণ বা গরম পানি দিয়ে ঘষে মেজে পরিষ্কার করে কড়া রোদে শুকানো। পুরানো জং ধরা খাঁচা হলে তা অবশ্যই পরিবর্তন করবেন। এরপর আপনার কাজ হলো মশারির ব্যবস্থা করা। নিম পাতা বেটে যে রস বের হয় তা প্রতিদিন অন্তত ৩-৪ বার নরম কাপড়, তুলা বা টিস্যু দিয়ে ভিজিয়ে গোটা গুলো মুছে দিবেন। প্রতিদিন অন্তত ২-৩ ঘন্টা পাখিকে রোদে রাখবেন। এমনভাবে রাখবেন যেন খাঁচার অর্ধেক রোদে এবং অর্ধেক ছায়ায় থাকে। পাখিকে গোসল করাবেন না, তাহলে গোটা শুকাতে আরো দেরী হবে। খুব গরম পড়লে হালকা স্প্রে করে দিতে পারেন, খেয়াল রাখবেন যেন গোটা গুলোতে পানি না পড়ে। এবার আসি খাবার-দাবারে। এই সময়টায় পাখিকে প্রচুর পরিমাণে শাকসবজি দেওয়া জরুরী, সাথে অন্যান্য পুষ্টিকর খাবার। আপনাদের সুবিধার্থে নিচে একটা ভালো ডায়েট চার্ট দেওয়া হলো, সেটা সম্পূর্ণ ফলো করবেন। এবং আরেকটা জিনিস দেওয়া জরুরী, সেটা হলো ACV (Apple Cider Vinegar)। এটার অনেক নকল বের হয়েছে এখন, যা যাচাই করা বেশ কষ্টকর। তাই ঝামেলা এড়ানোর জন্য বঙ্গবাজার, নিমতলী, ৬৮ নং দোকানের হাসান রাজ ভাইয়ের থেকে কিনুন (01689090909), হোম ডেলিভারি সার্ভিসও আছে। বাজ্রিগার, ফিঞ্চ, জাভা এবং অন্যান্য ছোট পাখির ক্ষেত্রে ২৫০ মিলি পানিতে ১০ মিলি, লাভবার্ড-ককাটিল, কবুতরর এবং মাঝারি সাইজের পাখির জন্য ২০ মিলি ACV মিক্স করে একটানা খেতে দিবেন। ৬ ঘন্টার বেশি খাঁচায় রাখবেন না।

পাখির প্রতিদিনের খাবার –

১| সীড মিক্স
২| যেকোনো ১ টি শাক / পাতা : পালং / কলমি /পুদিনা পাতা / সজনে পাতা / নিম পাতা / লাল শাক / ধনে পাতা ইত্যাদি
৩| যেকোনো ১ টি সবজি : এসপারাগাস/ ব্রকোলি/ বরবটি/বাধা কপি/ মিষ্টি কুমড়া/ ঝিঙ্গা / চিচিঙ্গা/শসা/সজনে ডাটা /মটরশুটি/সীম/ সীম এর বিচি/ কাচা পেপে/ পটল/ ঢেঁড়শ
৪| যেকোনো ১ টি ফল : আপেল / স্ট্রবেরি/ ফুটি / তরমুজ/ পেপে/ নাশপাতি/ পেয়ারা /কামরাঙ্গা/ আমড়া
৫| কাটল ফিশবোন্ (সাগরের ফেনা)
৬| ফুটানো এবং ফিল্টার করা টাটকা পানি : সকালে ১ বার & সন্ধায় ১ বার বদলে দিবেন
৭| সজনে পাতা – সাপ্তাহিক 2 দিন (এতে প্রচুর পরিমানে ক্যালসিয়াম , প্রোটিন, সবরকমের ভিটামিন ও মিনারেল আছে)
৮| অঙ্কুরিত বীজ – সাপ্তাহিক ২ দিন
৯| সেদ্ধ বুটের ডাল – সাপ্তাহিক ২ দিন
১0| শুকনো কুমড়ো বীজ – সাপ্তাহিক ২ দিন
১১| ঘৃতকুমারী টুকরা – সাপ্তাহিক ২ দিন ১২| সপ্তাহে ১ বার অথবা চিকিত্সার প্রয়োজন অনুযায়ী – তুলসী দ্রবণ (ঠান্ডায়), aloe vera /ঘৃতকুমারী দ্রবণ (গরমে, হজম & পালকের সমস্যায়)| সকাল থেকে ৬ ঘন্টা রেখে এরপর বদলে দিয়ে সাধারণ পানি দিবেন।
  • শাক সবজি, ফল দেয়ার আগে সবসময় বড় একবাটি পানিতে ভালমত ডলে ধুবেন ৩ বার।
  • ফল দেয়ার আগে বিচি ফেলে দিবেন।
এই চার্ট টা সম্পূর্ণ ফলো করবেন। সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে ১৫ দিনের মধ্যেই গোটা গুলো শুকিয়ে ঝড়ে পড়তে শুরু করবে। পুরোপুরি ঠিক হওয়ার পরই কেবল গোসল করাবেন, তার আগে নয়। ঠিক হয়ে যাওয়ার পরও অন্তত ৩ দিন চিকিৎসা চালিয়ে যাবেন। আর অনেক সময় পক্স খুব ভয়ানক রূপ ধারন করে, সেক্ষেত্রে আমার কাছ থেকে কিছু স্পেশাল সাপ্লিমেন্ট বা অয়েন্টমেন্ট সংগ্রহ করা লাগতে পারে।

Case_Study :

BIRDSWAY গ্রুপের দুজন সম্মানিত সদস্য Shehab Hossain এবং Sofiqur Rahman রিসেন্টলি পক্সের সম্মুখীন হয়েছিলেন। চলুন একটু জেনে আসি তাদের অভিজ্ঞতা !

Case Study 1 :

Shehab Hossain – তার একটা মেয়ে ককাটিল প্রায় বছর খানেক আগে পক্সে আক্রান্ত হয়েছিল। পাখিটার সব কিছুই ঠিকঠাক ছিল, কিন্ত একদিন হঠাৎ দেখতে পান পাখিটা এক পা উঁচু করে ডালে বসে আছে। বেশ কয়েকবার লক্ষ্য করার পর তিনি ভাবলেন পাখিটা হয়তো পায়ে ব্যাথা পেয়েছে, তাই তিনি পাখিটা ধরে বাইরে আনলেন এবং উক্ত পা টা খুটিয়ে খুটিয়ে দেখলেন। তেমন কিছু না পেলেও হঠাৎ তার নজর পড়ে পায়ের তলায়। সেখানে মশার কামড়ে যেরকম ফুলে যায় তেমন একটা গোটা। তিনি পটাশ ব্যবহার করেছিলেন, কিন্ত কোনো লাভ হয়নি, বরং ওটা ধীরে ধীরে বড় হতে থাকলো এবং ৪-৫ দিনের মধ্যেই ডানার তলা সহ শরীরের বেশ কয়েকটা স্থানে এমন গোটা ছড়িয়ে পড়লো। তিনি তৎক্ষণাৎ আমার সাথে যোগাযোগ করলে আমি তাকে উপরোক্ত উপায়ে ট্রিটমেন্ট শুরু করতে বলি। তিনি চেষ্টা করতেন প্রতিদিন খাঁচাটা ঘষে মেজে রোদে শুকাতে। প্রতিটা খাঁচার জন্যই তিনি মশারির ব্যবস্থা করেছিলেন। নিমপাতার রস দেওয়ার পাশাপাশি আমার দেওয়া একটি অয়েনমেন্টও তিনি গোটা গুলোতে প্রয়োগ করেছিলেন, সাথে ছিল পুষ্টিকর খাবার এবং এসিভি। পাখিটা অনেক দূর্বল থাকার কারণে এসময় ঠিকমত খেতে পারছিল না, কিন্ত তার সঙ্গী ছেলে পাখিটা নিয়মিত মেয়েটাকে খাইয়ে দিত। আস্তে আস্তে গোটাগুলো ঝরে পড়তে শুরু করে এবং ১৫ দিনের মাথায় পাখিটা সম্পূর্ণ সুস্থ্য হয়ে যায় !

Case Study 2 :

Sofiqur Rahman : ওনার একটি কবুতরের বাচ্চা কিছুদিন আগে পক্সে আক্রান্ত হয়েছিল। প্রথম প্রথম হলুদ বর্ণের বড় বড় ঘামাচির মত ছিল। ধীরে ধীরে ওগুলো বড় হতে থাকলো এবং সারা মুখমন্ডল, ঠোঁট, চোখের পাতা গোটাতে ভরে গিয়েছিল। তিনি তার এক বন্ধুর শরণাপন্ন হন এবং সে বলেছিল এগুলো মশার কামড়, পটাশ দিলে ঠিক হয়ে যাবে। কিন্ত পটাশ ব্যবহার করেও তিনি কোনো ফল পাননি এবং গোটা গুলোও আকারে এবং পরিমাণে বাড়তে শুরু করে। আমার একটা পোস্টে তিনি তার সমস্যার কথা জানান এবং আমি উপরোক্ত উপায়ে তাকে ট্রিটমেন্ট শুরু করতে বলি। তিনি ২৫০ মিলি পানিতে ২০ মিলি এসিভি মিক্স করে একটানা ৫ দিন বাচ্চাটিকে খাইয়েছিলেন। পাশাপাশি নিমপাতার রস দিয়ে নিয়মিত গোটা গুলো মুছে দিয়েছেন। ৫-৬ দিনের মধ্যেই গোটা গুলো আস্তে আস্তে ঝরে পড়তে শুরু করে। এ সময় বাচ্চাটা তার বাবা-মায়ের সাথে থাকলেও মুখের গোটা অনেক বড় হওয়ার কারণে বাবা-মা খাওয়াতে পারছিল না। তাই তিনি পাখিটাকে আলাদা করে অন্যান্য বাচ্চাদের সাথে রেখেছিলেন এবং ঠাটারি বাজারের একটি কবুতরের দোকান থেকে গুড়া খাবার এনে পানিতে গুলিয়ে ১৫ সিসি করে ৩ বেলা খাইয়েছিলেন। আরো সপ্তাখানেক পর বাচ্চাটির সব গোটা প্রায় ঝরে গেছিলো এবং তিনি আরো তিনদিন আমার চিকিৎসা চালিয়ে গেছেন। আল্লাহর রহমতে বাচ্চাটা এখন সম্পূর্ণ সুস্থ।
এই ছিল আমাদের দুই সম্মানিত সদস্যের অভিজ্ঞতা। বুঝতেই পারছেন, পক্স হলে ঘাবড়ানোর কিছুই নেই, সঠিক চিকিৎসা দিয়ে এটি অবশ্যই নির্মূল করা সম্ভব।
Special Thanks : Shehab Hossain & Sofiqur Rahman
Instructions & Informations : Sifat E Rabbani (Holistic Treatment & Nutrition Consultant, The Fig Tree Health Group USA, Certified Aviculturist, American Federation of Aviculture, USA.)